সংসার কে জীবন্ত রাখতে চান? এই ৭ টি বিষয় আমল করুন

একজন মুসলমানের কাছে তার পরিবারের গুরুত্ব অপরিসীম। তার দ্বীন পালনে পরিবার এক কঠিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যার পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যায় তার দীন পালন ও দুর্বল হয়ে যায়। অথচ আমাদের সমাজে এই পরিবার বিষয়টা অত্যন্ত অবহেলিত অবস্থায় আছে। পরিবার তো আছেই কিন্তু তার মাঝে প্রাণ নেই, নেই ভালোবাসা নেই মায়া। আধুনিক যুগে পারিবারিক বন্ধনের অবস্থা তো খুবই সঙ্গীন। সমাজের গঠনের ক্ষুদ্রতম একক পরিবার। যে সমাজে পরিবার ভালো থাকে সে সমাজ এমনিতেই উপরে উঠে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে যার পরিবার সুগঠিত থাকে সে পরিবারের যে পুরুষ থাকেন তার কর্মজীবন সাফল্যমণ্ডিত হয় এবং সে উন্নতির শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হয়।

1. সবকিছুতেই সবার আগে মহান আল্লাহ তায়ালাকে সামনে রাখা

পরিবারের ভেতর পারস্পরিক সম্পর্ক হতে হবে আল্লাহ তায়ালাকে সামনে রেখে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক পারস্পরিক ব্যবহার কেমন হতে হবে তা কোরআনে বলে দিয়েছেন। আল্লাহর নির্দেশকে সামনে রেখেই যখন পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের সাথে জীবন যাপন করবে তখন স্বাভাবিকভাবেই পরিবারে শান্তি আসবে কারণ সে ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে আল্লাহর জন্যই ভালবাসবে, ঝগড়া জড়াবে না পরস্পরকে সাহায্য করবে এবং একজন আরেকজনকে ক্ষমা করতে শিখবে। স্বামী-স্ত্রীর এবং স্ত্রী হয়ে স্বামীর দোষত্রুটি উপেক্ষা করা এবং ক্ষমা করে দেয়া একটি সুখী পরিবার গঠনের মূলমন্ত্র।

2. ছোটখাটো দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা এবং মাফ করে দেয়া

মহান আল্লাহতাআলা কুরআনে বলেছেন, 
“যে ক্ষমা করে ও আপোষ করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে; নিশ্চয় তিনি অত্যাচারীদেরকে পছন্দ করেন নাই।” (৪২:৪০)

তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষক্রটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা কর না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।” (২৪:২২)


যদিও আগের পয়েন্টে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে তারপরও এই তারাই আরেকটু বিস্তারিত বলা হচ্ছে। মানুষ যাকে ভালোবাসে যার সাথে তার অন্তর যুক্ত থাকে সে যখন কোন কষ্ট দেয় সেই কষ্ট অনেক বেশি আকারে দেখা দেয়। কারন মানুষ যাকে ভালোবাসে তার কাছ থেকে একটু বেশিই আশা করে।
এ কারণে যখন প্রিয়জন কোন কষ্ট দিয়ে ফেলে তখন কষ্টের মাত্রাটা বেশি অনুভূত হয় এ কারণে অনেক সময় ক্ষমা করতে বা উপেক্ষা করতে মন চায় না। প্রিয়জনকে ক্ষমা করুন তার জন্য নয় বরং নিজের জন্য। তাহলে মহান আল্লাহতায়ালা আপনাকে অনেক বড় রকমের পুরস্কার দিবেন এই কথাটা মাথায় রেখে নিজের জন্যই তাকে ক্ষমা করুন আল্লাহ ক্ষমা করতে পারবেন আর আধুনিক বিজ্ঞান বলেছেন যে ক্ষমা করে দিতে পারে তার মন মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকে কারণ ক্ষমা করার ফলে মনের ভিতর সেটা নিয়ে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে।

3. সবসময় মুখে মুচকি হাসি জারি রাখুন


জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা: বলেছেন নবী করিম সাঃ কখনোই তার সাক্ষাত লাভ নাকচ করেননি এবং আমি ইসলাম গ্রহণের পর হাসি ছাড়া কখনোই তাকে দেখিনি। (বুখারী)
এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে মুসলমান ভাইয়ের দিকে হাসি দিয়ে কথা বলা ও সদকা। (তিরমিজি)

হাসি টা আসলে অনেকটা সংক্রামক এর মত। ভেবে দেখ মন কেউ আপনার সাথে হাসি মুখে কথা বলে আপনিও হাসিমুখে তার কথার উত্তর দিতে চান আপনার অবচেতন মন সেটাই বলে তাই যখন পরিবারের ভিতরে আপনি হাসি কে জারি করে দিবেন আপনার পারিবারিক জীবন এমনিতেই ভালো হয়ে যেতে বাধ্য হ্যাঁ তবে এমন কিছু সময় আছে যখন সবর করা কষ্ট হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি কে সামনে রেখে এবং সুন্নাহ পালনের নিয়াতে হাসি জারি রাখবেন। মনে রাখবেন যে আমলে কষ্ট যত বেশি সে আমলের সওয়াব ও বেশি।

4. বাহিরের ফাস্টফুডের খাবার পরিহার করুন, বাসায়ই সুস্বাদু খাবার রান্না করুন

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন বাসায় খাবার রান্নার সাথে সুখী পরিবার গঠনের ভূমিকা কি সম্পর্ক। কিন্তু এর একটা শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে। ছোটবেলায় আমাদের নানী দাদী বা মা যখন বাসায় খুব যত্ন করে কিছু রান্না করতেন কিছু বানাতেন আমরা খুব তৃপ্তি সহকারে তা খেতাম এমনকি এখনও কিন্তু আমরা সেই দিনগুলিকে স্মরণ করি অনেকটা নস্টালজিয়ার মত। তাই যখন বাড়িতে যত্নসহকারে কোন খাবার রান্না করা হয় এবং পরিবেশন করা হয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করে।

5. রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন


রাসুল সাঃ হতে হাদীসে এসেছে যে সেই ব্যক্তি শক্তিশালী নয় যে কুস্তিতে একজন আরেকজনকে হারিয়ে দেয় বরংচ সেই ব্যক্তি শক্তিশালী যে তার রাগকে দমন করতে পারে। (আহমদ)

পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে এই রাগ। রাগের বশে অনেক সময়ই অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। অনেক সময়ে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটে যায়। কাজেই রাগকে সংবরন করা অত্যাবশ্যকীয়। হাদিসে এসেছে যদি কারো রাগ হয় সে যেন বলে আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজীম, তাহলে তার রাগ দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আরেক বর্ণনায় এসেছে যার রাগ হয় সে যেন চুপ থাকে। রাগের ফলে এমন সব অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে যায় যার ফলে পরবর্তীতে সারা জীবন আফসোস করতে করতেই কেটে যায়।

6. পরিবারের সদস্যদের সীমাবদ্ধতা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন


কোন মানুষই পরিপূর্ণ নয় সবার মাঝেই কিছু না কিছু দোষ ত্রুটি থাকে পরিবারের সদস্যরাও তার ব্যতিক্রম নয় পরিবারের সদস্যদের ভুল-ত্রুটি সীমাবদ্ধতাগুলো কে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। হয়তো আপনার সন্তান আপনার সাথে হঠাৎ বেয়াদবি করে ফেলেছে অথবা আপনার স্ত্রী আপনার সাথে অভিমান করে বসে আছে এসব ক্ষেত্রে সেগুলো উপেক্ষা করতে হবে এবং ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে হয়তো আপনার তা করতে কষ্ট হবে বা পছন্দ হবেনা কিন্তু সেটা উপেক্ষা করতে পারাটা একটা বড় সুন্নাহ।
বয়স কম হওয়ার কারণে অনেক সময় সন্তান রায় কিছুটা বিপথে চলে যায় কারণ এখনকার সময়ে হচ্ছে ইন্টারনেট টেলিভিশনের যুগ এসব ডিভাইসে খুব সহজেই গুনাহের নাগাল পাওয়া যায় যা কোমলমতি সন্তানদের আঘাত করে যদি এরকম কিছু হয়ে যায় তাহলে তাদেরকে ভালোভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেন এবং সঠিক পথের দিকে বারবার উপদেশ দিতে থাকেন। চিল্লাফাল্লা করে পরিস্থিতি খারাপ করবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
“হে ঈমানদানগণ! ধৈর্য্য ধারণ কর এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার।” (৩:২০০)

“বলুন, হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়াতে সৎকাজ করে, তাদের জন্যে রয়েছে পুণ্য। আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। যারা সবরকারী, তারাই তাদের পুরস্কার পায় অগণিত।” (৩৯:১০)

“……।আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে…।” (৮:৪৬)

7. পরিবারের জন্য অন্তর থেকে বেশী বেশী দোয়া করা 


উপরের আলোচনা গুলো হচ্ছে মানুষের চারিত্রিক বিষয় কিন্তু সেগুলো মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য ছাড়া কি অর্জন করা সম্ভব অবশ্যই নয় তাই আমাদের উচিত বেশি বেশি দোয়া করা আমাদের নিজের জন্য আমাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য স্ত্রী সন্তানদের জন্য যেন আমরা তাদের হক বা অধিকার সঠিকভাবে আদায় করতে পারি এবং সুখী পরিবার পেতে পারি। এরকম কয়েকটি দোয়া নিচে দেয়া হল:
হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ কর। (২৫ঃ৭৪)


হে, আমার পালনকর্তা! তোমার নিকট থেকে আমাকে পুত-পবিত্র সন্তান দান কর-নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থনা শ্রবণকারী। (৩ঃ৩৮)
হে পালনকর্তা, এ শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তান সন্ততিকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন। (১৪ঃ৩৫)

হে আমার পালনকর্তা, আমাকে নামায কায়েমকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্যে থেকেও। হে আমাদের পালনকর্তা, এবং কবুল করুন আমাদের দোয়া। (১৪ঃ৪০)

শেয়ার করে অপর ভাইকে আমল করার সুযোগ দিন।

Leave a Reply