রমাযান পরবর্তী ইবাদাতে উদ্দীপনা ধরে রাখতে করণীয়













আরবী বারোটি মাসের মাঝে রমাযানের মর্যাদা সর্বাধিক। এই মাসে ইবলিসকে শৃংখলিত করা হয়, জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। বহু সংখ্যক মুসলমানদেরকে দলে দলে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে পড়া ছাড়াও নিয়মিত তারাবী আদায় করতে দেখা যায়। অথচ তাঁদের মাঝে অনেকেই অন্য মাসে এই সালাতগুলো আদায় করতোনা। ঠিক একারণেই যে দিন থেকে রমাযান শেষ হয়ে যায় এবং শাওয়াল এর মাস শুরু হয়, অধিকাংশ মুসলিম ভাই বোনেরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। রমাযানে যা অর্জন হয়েছিল, তা অতীতই থেকে যায়।    
আবার অন্যভাবে ভাবুন। আমাদের অনেক ভাইবোনেরা রমাযানের পরে তাঁদের রমাযানে পালনীয় আমলগুলো ধরে রাখতে না পারার জন্য হতাশায় ভোগে। এটিও আসলে সঠিক না। রমাযান মাসে শয়তান শৃংখলিত থাকে। মাঠে আমরা সবাই প্রতিপক্ষ ছাড়া। অনেকটা ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার মতো। এটা আল্লাহর পক্ষ হতে উম্মতে মোহাম্মদীর প্রতি অসীম করুনা ছাড়া আর কিছু নয়। কাজেই ফাঁকা মাঠে যত গোল দেয়া সম্ভভ, প্রতিপক্ষ থাকলে আসলে ততো গোল দেয়া সম্ভব নয়। কাজেই, রমাযানের বাহিরে যে আপনার আমল কমে যাবে, এটাই স্বাভাবিক, এটাই বাস্তবতা। সর্বোপরী, রমাযানে যে পরিবেশ বিরাজ করে তা ইবাদাতের অনুকুল থাকে। চাকরী, ব্যবসা, লেখাপড়ায় ও অনেক ছাড় দেয়া হয়। তার মানে এই নয় যে, আমরা পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকবো কোন রকম চেষ্টা চরিত্র ছাড়া।
রমাযানের পর আমলের গতি এবং উদ্দীপনা ধরে রাখার অন্যতম চাবিকাঠি হল বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সেগুলোর উপর সর্বাত্নকরণ মনযোগ দেয়া।

রমাযান পরবর্তী উদ্দীপনা ধরে রাখতে আপনি এই পাঁচটি বিষয়ের উপর মনযোগ দিতে পারেন। ইন-শা-আল্লাহ এর মাধ্যমে আপনি রমাযানের পরেও আপনার ঈমানী শক্তি ধরে রাখতে পারবেন।

১। কোরআন পড়ুন, কোরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ুন

কোরআনের সাথে আপনার সম্পর্ক ধরে রাখুন। যদি রমাযান মাসে প্রতিদিন আপনি কোরআনের এক জুঝ পড়ে অভ্যস্ত থাকেন, এখন অন্ততপক্ষে দুই পৃষ্ঠা পড়ার অভ্যাস করুন। রমাযান মাসে যদি দৈনিক এক ঘন্টা কোরআনের তাফসীর শুনে থাকেন, রমাযার পরে অন্তত ১৫ মিনিট হলেও তাফসীর শুনুন। রমাযানে কোরআনের যে আমলগুলো করতেন, কম হোক, সেই আমলগুলো করার চেষ্টা করুন। আমল কম করাটা আসলে কোন সমস্যা না। বরং প্রতিদিন আপনি কোরআনের সাথে সম্পর্ক রাখছেন, এটাই মূখ্য বিষয়।  
তোমাদের মাঝে সেই ব্যক্তি উত্তম যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়” 
(সহীহ বুখারী৪৭৩৯)

২। শাওয়াল মাসের ছয় সাওম/রোযা রাখা

এই আমল আমাদের অনেকের জন্যই কঠিন হলেও এর প্রতিদান বা পুরস্কার অসীম। রমাযান মাসে রোযা রাখা আসলে অনেকটাই সহজ, কারণ আসেপাশে সবাই পালন করছে। কিন্তু রমাযান এর বাহিরে রোযা রাখা আসলেই কষ্টকর। রমাযানের বাহিরে রোযা রাখতে গেলে প্রয়োজন প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি এবং দৃঢ় সংকল্প। আমরা রাসুলের হাদিস থেকে জানি যে, যে রমাযান মাসের সবগুলো রোযা রাখল, সেই সাথে শাওয়ালের ছয়টি রোযা রাখল, সে যেন সারা বছর রোযা রাখল। শাওয়ালের ছয় রোযা রাখার অনুপ্রেরণা হিসেবে এই হাদিসই যথেষ্ট।

“যে রমাযান মাসে পূর্ণ রোযা রাখল, সেই সাথে শাওয়ালের ছয়টি রোযা রাখল; সে যেন সারা বছরই রোযা পালন করল” (সহীহ মুসলিম-১১৬৩)

 ৩। নিজের ব্যাপারে অতি উচ্চাশা

আমরা অনেক সময়ই নিজের কাছ থেকে অনেক বেশী কিছু আশা করি। আল্লাহর ইবাদাতের ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতার উপর অনেক বেশি নির্ভর করি। আমরা ভাবি যে, আমরা একদম নিষ্পাপ হয়ে যাবো, আমাদের কোন গুনাহ্‌ই থাকবে না রমাযানের পর। এভাবে চলব আমৃত্যু। কিন্তু যখন ব্যর্থ হই, হাল ছেড়ে দিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসি। নিষ্পাপ থাকার পুরো ধারণাটাই আসলে ভুল। নিষ্পাপ থাকলেই জান্নাত নিশ্চিত হয়ে গেল তা নয়। জান্নাত পাওয়া যায় মহান আল্লাহতাআলার ক্ষমা ও রহমতের উসিলায়।
কাজেই নিজের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। সেটা অর্জন করার জন্য কঠোর পরিশ্রম ও করুন। কিন্তু লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে নিজেকে হতাশায় ফেলবেন না। আমরা ইনসান, আর ইনসান মানেই সে ভুল করবে। কাজেই ভুল হয়ে গেলে তওবা করুন। খাঁটি তওবা! দেখবেন আপনি আল্লাহ পাকের অনেক কাছে পৌঁছে গেছেন। আপনার সর্বোচ্চ দেয়ার চেষ্টা করুন। আপনার নিয়্যত এবং এখলাস যদি ঠিক থাকে, আপনি সফল হবেন ইনশাল্লাহ।

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা অত্যধিক ইবাদাতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নিকটবর্তী হও, এবং মানুষকে শুভ সংবাদ দাও। কারণ কারো আমলই তাঁকে জান্নাতে নিবে না। তখন সাহাবার বললেন, হে রাসুল (সাঃ), আপনিও না! রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করলেন, আমিও না।যদি না আল্লাহ আমাকে স্বীয় রহমতে জান্নাত দান না করেন। জেনে রেখ, আল্লাহর কাছে সেই আমলই প্রিয়, যা নিয়মিত করা হয়।” (সহীহ মুসলিম-২৮১৮)

৪। প্রতিনিয়ত তওবা ইস্তেগফার করুন

 আমরা সবাই ভুল করি। ইছছায় এবং অনিচ্ছায় প্রতিনয়ত গুনাহে লিপ্ত আছি। একজন নেককার এবং বদকারের মাঝে পার্থক্য এই নয় যে, বদকারের গুনাহ বেশী আর নেককারের গুনাহ কম। বরং বদকার এবং নেককারের গুনাহের পার্থক্য হল, গুনাহ প্রকাশ না করা এবং তওবা। নেককার মানুষ মাত্রই তওবায় লিপ্ত থাকে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, রমাদানের পর আপনি হয়তো ঐসব গুনাহে লিপ্ত হয়ে যেতে পারেন যা রমাদানে হয়নি।

এরকম হলে হতাশ হবেন না। এরকম হলে হাল ছেড়ে দিবেন না। কারণ শয়তান আপনাকে হতাশ করতে চায়, নিরাশ করতে চায়, চায় যেন আপনি হাল ছেড়ে দেন। শয়তানকে জিততে দিবেন না। গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে তওবা করে ফিরে আসুন। কারণ আমরা আল গাফুর (অতিশয় ক্ষমাশীল) এবং আর-রহীম (অতিশয় দয়ালুর) বান্দা।

“যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা যদি এমন জাতি হতে যারা গুনাহ করেনা, তাহলে আল্লাহপাক তোমাদের পরিবর্তে এমন জাতির উদ্ভব ঘটাতেন যারা গুনাহ করতো এবং আল্লাহর কাছে তওবা করতো এবং আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিতেন।” (সহীহ মুসলিম ২৬৮৭)

৫। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে থাকুন

যদিও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের কথা সবার শেষে উল্লেখ করেছি, কিন্তু এটার গুরুত্ব অন্য সবগুলোর চেয়ে সর্বাধিক। যতো কিছুই হোক, আপনার ঈমানের হাল যতো নিম্নই থাকুক না কেন, আপনি উপরের সব আমল বা দিয়ে দিলেও নামাজের ক্ষেত্রে কোন ছাড় নাই, সুযোগই নাই। কোন অবস্থাতেই নামাজ তরক করা যাবেনা।
নামাজ হলো বান্দার জন্য মিরাজ। মহান রব্বের সাথে সম্পর্ক স্থাপন। বান্দার ক্ষমার দরজা, জান্নাতের টিকেট। নামাজের মাধ্যমে বান্দা তাঁর রবের সাথে কথা বলে থাকে। এই নামাজ বান্দার কষ্টের মাঝে আশা জাগায়। দুঃখের সময় প্রশান্তি দেয়। সুখের সময় শোকর আদায়ের প্রয়াস পায়। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটা হলো আপনার ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। যদি আর কিছুই না পারেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ অবশ্যই নিয়মিত আদায় করবেন।
 
 “শেষ বিচারের দিনে সর্বপ্রথম বান্দার যে আমলের হিসেব নেয়া হবে তা হলো নামায। যার নামাযের হিসেব ঠিক হবে, তাঁর বাকি হিসেব ও সহজ হয়ে যাবে। আর যার নামায ঠিক হবে না, তাঁর বাকি হিসেব ও কঠিন হয়ে যাবে।” (আত-তাবারানী)

মহান আল্লাহ পাক আমাদের এই বিষয়গুলো আমল করার তাওফীক দান করুন।

Leave a Reply