রমজানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত

রমজানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত

আল্লাহর সাথে যে ব্যবসা করতে চায়, তার সব সময় ফিকির থাকবে কি করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা যায়। বান্দার ইবাদাত নিজেই আল্লাহrর সাথে এক রকমের ব্যবসায়িক লেনদেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামায কায়েম করে, এবং আমি যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা আশা কর, যাতে কখনও লোকসান হবে না।

সূরা ফাতিরঃ ২৯

কোরআন তেলাওয়াত করা, নামাজ পড়া, প্রকাশ্যে ও গোপনে দান খয়রাত করা; এ সবকিছুই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের মাঝে এটা খুব সাধারন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, বেশির ভাগ লোক কোন না কোন ধরনের ইবাদতে আটকে যায়। আর এর বাইরে অন্য কোন ইবাদত করতে পারে না। ফলে, সময়ের সাথে সাথে অনেক ইবাদত একসময় অপরিচিত, অবহেলিত হয়ে পড়ে। এমন তালিকা করতে গেলে অনেক লম্বা হবে। তবে এর মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হল ইস্তেগফার, তাফাক্কুর এবং তাব্বাতুল।

ইস্তেগফার-ফজরের আগে

প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হল, ফজরের আযানের আগে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। অর্থাৎ ইস্তেগফার করা। এটি তাহাজ্জুদ এবং তারাবি থেকে ভিন্ন ধরনের ইবাদত। আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করার জন্য এই ইবাদত অনন্য। আল্লাহতাআলা বলেন,

তারা ধৈর্য্যধারণকারী, সত্যবাদী, নির্দেশ সম্পাদনকারী, সৎপথে ব্যয়কারী এবং শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।

সূরা আল ইমরান আয়াত ১৭

আয়াতের শেষে আল্লাহ বলছেন “এবং যারা রাতের শেষভাগে ইস্তেগফার করে।”

সাহরী রাতের শেষাংশে, ঠিক ফজরের আগের সময়টাতে করা হয়। এজন্য একে সাহরী বলা হয়। কারণ, এটা রাতের শেষে করা হয়। কিয়ামুল লাইল, কুরআন তেলাওয়াত এবং জিকির-আজকারের পর আপনি হয়তো এখন পরিবারের সাথে সেহেরী করার জন্য প্রস্তুত। এর মধ্যেই এসব থেকে একটু সরে গিয়ে, ফজরের ঠিক আগে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। এর ফজিলত এত বেশি যে আপনার উপরের আয়াত প্রযোজ্য হবে।
রমাদান হলো আরও কিছু নতুন এবাদত শুরু করা ও নিজের উন্নতি ঘটানোর এক ঈমানী থেরাপি। ফজরের তিন বা পাঁচ মিনিট আগে ইস্তেগফারের জন্য বসে পড়ুন। আবার অতি উৎসাহী হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে কাজ করতে যাবেন না। কারণ এটা শয়তানের একটা চাল হতে পারে। কেউ হয়তো একটা ইবাদতের ফজিলত শুনে উত্তেজিত হয়ে পড়ল। শয়তান তখন তাকে এই কাজে দীর্ঘক্ষন লাগিয়ে রেখে ইবাদতের প্রতি তার আগ্রহ শেষ করে ফেলল। এক রাত এবাদত করার পরেই ইবাদত ছেড়ে দেয়। ইবাদত করা হলো নতুন গাড়ি কেনার মত। দোকানদার আপনাকে বলে দেবে, আস্তে আস্তে ইঞ্জিনের জড়তা কাটাতে। শুরুতেই ৭০ মাইল বেগে চালাতে শুরু করলে হবে না। আস্তে আস্তে শুরু করতে হবে। একদিন অনেক ইবাদত করে ছেড়ে দেয়ার চাইতে, নিয়মিত অল্প অল্প ইবাদত করা উত্তম।
এর ফলে মানুষের জীবনে অতুলনীয় ফজিলত আসতে শুরু করে। আপনার যদি আর্থিক সমস্যা থাকে, যদি নিঃসন্তান দম্পতি হয়ে থাকেন, যদি কোন বিপদের মধ্যে থাকেন, তাহলে ইস্তেগফার হলো এসব কিছুর ঔষধ। কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত আর ইস্তিগফারের উত্তম সময় হল ফজরের আগে।

তাফাক্কুর

দ্বিতীয় যে ইবাদত আমরা প্রায়ই ভুলে গিয়েছি সেটা হল তাফাক্কুর। এর অর্থ হলো গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা। আল্লাহর নাম সমূহ, সত্তা, গুণাবলী, অক্ষমতা নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা। আল্লাহর নিদর্শন সমূহ, যেমনঃ আকাশ, জমিন, পাহাড়, দিন-রাত, বাতাস, কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। আল্লাহর সৃষ্টির ক্ষমতা নিয়ে ভাবা।

এখন আপনার মনে হতে পারে এটা তো সুফিদের কাজ। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই এমন কিছু না। কারণ এই ইবাদতের কথা কোরআনে আছে। আল্লাহ বলেন,

নিশ্চয় আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধ সম্পন্ন লোকদের জন্যে।

সূরা আল ইমরান আয়াতঃ ১৯০

আল্লাহ পরের আয়াতে বলছেন, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে। আল্লাহ বলছেন ইয়াতাফাক্কারুন। এভাবে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে যখন কেউ গভীর চিন্তা-ভাবনা করে, তখন এই চিন্তা তাদের কে কোথায় নিয়ে যায়, আল্লাহ তায়ালা আয়াতের পড়ার অংশেই তা বলে দিয়েছেন

যাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে, ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষযে, (তারা বলে) পরওয়ারদেগার! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদিগকে তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও।

সূরা আল ইমরান আয়াতঃ ১৯১

তিনিই ভুমন্ডলকে বিস্তৃত করেছেন এবং তাতে পাহাড় পর্বত ও নদ-নদী স্থাপন করেছেন এবং প্রত্যেক ফলের মধ্যে দু’দু প্রকার সৃষ্টি করে রেখেছেন। তিনি দিনকে রাত্রি দ্বারা আবৃত করেন। এতে তাদের জন্যে নিদর্শণ রয়েছে, যারা চিন্তা করে। সূরা রাদঃ আয়াত ৩

এবং যমিনে বিভিন্ন শস্য ক্ষেত্র রয়েছে-একটি অপরটির সাথে সংলগ্ন এবং আঙ্গুরের বাগান আছে আর শস্য ও খজ্জêুর রয়েছে-একটির মূল অপরটির সাথে মিলিত এবং কতক মিলিত নয়। এগুলো কে একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়। আর আমি স্বাদে একটিকে অপরটির চাইতে উৎকৃষ্টতর করে দেই। এগুলোর মধ্যে নিদর্শণ রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তা ভাবনা করে।

সূরা রাদঃ আয়াত ৪

শরীরের সাথে আত্না যেভাবে চলে, এই ইবাদত আপনার অন্যান্য ইবাদতের সাথে সবসময় পাশাপাশি চলবে। তাফাক্কুর দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু নয়। বরং এটা হারিয়ে যাওয়া এক ইবাদত। পাপের কারণে যে কালেমা দিয়ে অন্তর কালো হয়ে যায়, তাফাক্কুর এর মাধ্যমে তা আবার উজ্জ্বল হয়ে যায়। এই ইবাদত আপনার মাঝে আল্লাহর প্রতি ভরসা, ভয়, ভালোবাসা, আশা, নির্ভরতা ও ক্ষমা প্রার্থনা বৃদ্ধি করবে। আপনার কঠিন অন্তঃকরণ কে নরম করবে। যখন আপনি আল্লাহর ক্ষমতা নিয়ে ক্রমাগত চিন্তাভাবনা করবেন তখন আপনি বিনয়ী হয়ে যাবেন।

আপনার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে চিন্তা করুন। জান্নাতে আপনার প্রাসাদ আর আশে পাশের প্রতিবেশী কেমন হবে তা নিয়ে ভাবুন। জান্নাতে আপনার বাড়ির সামনের আর পেছনের বাগান কেমন হবে, আপনার প্রাসাদের ছাদ কত বড় হবে, ভাবনাহীন এক জীবনে আপনার পরিবারের সাথে পুনর্মিলিত হওয়ার পর আপনার অনুভুতি কেমন হবে, তা নিয়ে ভাবুন। দুনিয়া নামক এই জেলখানার দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে এসব ভাবনা কাজে দেবে। এটি আপনার মনে প্রশান্তি এনে দেবে। আল্লাহর দিদার লাভের ব্যাপারে ভাবুন। এটি আপনার মাঝে তার প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দিবে, তাকওয়া বৃদ্ধি করবে। জাহান্নাম নিয়ে ভাবুন। সেখানকার দুর্দশা, শাস্তি নিয়ে ভাবুন। এটা আপনার অন্তর নরম করবে। তওবা করতে উৎসাহ জোগাবে। পাপের জন্য অনুশোচনা জাগাবে।

তাব্বাতুল

তৃতীয় ও সর্বশেষ অবহেলিত আমল হলো দুনিয়ার সব বিষয় থেকে নিজেকে পৃথক করে আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন

আপনি আপনার পালনকর্তার নাম স্মরণ করুন এবং একাগ্রচিত্তে তাতে মগ্ন হোন।

সূরা মুযাম্মিল, আয়াত ৮

নিজেকে আল্লাহর জন্য পুরোপুরি সমর্পণ করে দেওয়া। মারিয়াম আলাইহিস সাল্লাম এর একটি ডাকনাম ছিল, আলবাতুল। এই নামটি এসেছে তাবাত্তুল থেকে। তিনি নিজেকে দুনিয়া থেকে পৃথক করে রেখেছিলেন, যাতে তিনি আল্লাহর ইবাদত করতে পারেন। এটাই হলো তাবাত্তুল। এর অর্থ আবার এই না যে কোন গুহার ভেতরে গিয়ে সব কাজ ছেড়ে বসে থাকতে হবে।

দুনিয়াকে পেছনে ফেলে আল্লাহর জন্য সময় ব্যয় করুন, ৫ মিনিট, ২০ মিনিট যাই হোক না কেন। সালাত, জিকির, দোয়া কুরআন তেলাওয়াত করা, ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর জন্য নিজেকে সমর্পণ করে দেয়াই হলো তাবাত্তুল। তাবাত্তুলের উপযুক্ত সময় হলো রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশ।

Leave a Reply