বন্ধু বা সাথী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে সাতটি বিষয় লক্ষ্য রাখবেন

বন্ধু! আমাদের জীবনে অতপ্রতোভাবে জড়িয়ে থাকা এক শব্দ। আমাদের জীবনের সুখে দুঃখে আমরা বন্ধুর সাথেই আমাদের জীবনের অংশ গুলো ভাগ করি। এই বন্ধুই আমাদের জীবনকে গুছিয়ে সুন্দর করে দেয়, আবার এই বন্ধুই জীবনকে নিয়ে যায় অন্ধকারের অতলে। বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলামের বেশ কিছু দিক নির্দেশনা রয়েছে। নিচের ৭ টি পয়েন্ট আমাদেরকে মনে রাখতে হবে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে।  

১। গুনাহের দিকে আহ্বানকারী বন্ধুঃ

বন্ধু যদি সিগারেট সামনে দিয়ে বলে, “একটা টান দিয়ে দ্যাখ না দোস্ত! ভাল লাগবে।” তার ব্যাপারে সাবধান হউন। যে বন্ধু আপনাকে গুনাহের দিকে দাওয়াত দিতেই থাকে, তার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন এবং সেই গুনাহে আপনিও লিপ্ত হওয়ার আগে সেই বন্ধুর সাথে সম্পর্কের যবনিকা টানুন।
মানুষ হিসেবে আমরা সবাই গুনাহগার। কেউই আমরা শতভাগ পবিত্র নই। কিন্তু তাই বলে যে বন্ধু গুনাহে লিপ্ত এবং এই জন্য সে অনুতপ্ত, আর যে বন্ধু গুনাহে লিপ্ত কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নয়; বরং সেই গুনাহে উলটা দাওয়াত দেয়, এই দুই বন্ধু কখনই এক হতে পারেনা।
এক্ষেত্রে প্রথমজনকে গুনাহ থেকে ফিরে আসতে সাহায্য করুন। দ্বিতীয়জনকে উপেক্ষা করুন।

২। উন্নাসিক মানসিকতা সম্পন্ন বন্ধুঃ 

বন্ধু যদি এমন হয়, সে সবসময় তার যা আছে তা নিয়ে অহঙ্কার করে বেড়ায়, সামাজিক মর্যাদা বা বিত্তের মুখোমুখী হলে শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে পড়ে, আর মর্যাদাহীন ব্যক্তির প্রতি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকায়। তাহলে তার সাথে বন্ধুত্বের ব্যাপারে সতর্ক হউন। কারণ তার সাথে অন্তরঙ্গ হলে আপনি দুভাবে প্রভাবিত হতে পারেন। একঃ হয় সে আপনাকেও তার মতো করে ফেলবে, দুইঃ না হয় এই গুনাহের প্রতি আপনাকে গা সওয়া করে দিবে। (অর্থাৎ এটাকে পরবর্তীতে আপনার কাছে আর ঘৃণ্য বলে মনে হবেনা।)
অহঙ্কার এবং অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কবীরা গুনাহ। বর্তমান সমাজের অরাজকতার অন্যতম কারণ এটা। একজন ভাল মুসলিম হতে হলে এধরনের মানুষ থেকে দূরে থাকতে হবে, দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তাদের সাথে অন্তরঙ্গ হতে হবে। ভাল মুসলিম হতে হলে বিনয়ের কোন বিকল্প নেই। 

৩। বদ নযর দেয় যে বন্ধুঃ 

আপনার সুসংবাদ গুলো কি আপনার বন্ধুর সাথে share করতে অস্বস্তি বোধ করেন? সেকি আপনার প্রতি একারণে ঈর্ষান্বিত হয়?
যে বন্ধু আপনার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়, মন থেকে খুশী হতে পারেনা; তার ব্যাপারে সতর্ক হউন। প্রকৃত বন্ধু সবসময় আপনার সাফল্য চাইবে। নিজের দিকে একবার খেয়াল করে দেখুন। আপনি ও মন থেকে আপনার বন্ধুর সাফল্য চাচ্ছেনতো?  

৪। যে বন্ধু তার যবানকে নিয়ন্ত্রনে রাখেনা:

এটা বেশ ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার। যদি আপনার বন্ধু এমন হয় যে, সে ঠাট্টার ছলে মিথ্যে বলে হাসায়, আরেকজনের নিন্দা করে তাহলে কিন্তু আপনি ভয়াবহ বিপদে আছেন। কারণ গীবত শোনা এবং গীবত করা উভয়েই একই দোষে দোষী। এধরনের বন্ধু থেকে নিজেকে বাচিয়ে চলুন। বেশী বেশী নসিহত করতে থাকুন।

৫। শিশুসুলভ বন্ধুঃ

আপনার বন্ধুটি কী ত্রিশোর্ধ হয়েও কি  বাসার বিলগুলো কিভাবে পরিশোধ করতে হয় জানেনা? সেকি এক জায়গায় বেশী দিন চাকরী করতে পারেনা? তাকে কী এখনও তার মা দেখাশোনা করে রাখেন? মনে রাখবেন, আপনার এই শিশু বন্ধুটি কখনই পুরুষ হয়ে উঠবেনা। এমন বন্ধু কিন্তু আপনাকে সামনে আগাতে বাঁধা দিবে। আপনার বিপদের সময় এদেরকে পাশে পাবেন না। আপনার কোন মহৎ কাজে এরাই সবসময় আপনাকে ভয় দেখাবে, পিছু হটাবে। বন্ধু হিসেবে আপনার দরকার পরিপূর্ণ মানুষ, বিরাট শিশু নয়। 
.

৬।  অলস বন্ধুঃ 

অলস বন্ধু আছে আপনার? অলসতা কিন্তু একটা ছোঁয়াচে ব্যাপার। একজনকে দেখে আরেকজনও অলসতায় অনুপ্রাণিত হয়। আপনি নিয়মিত নামায পড়েন। হঠাৎ একদিন হয়তো ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। তখন যদি পাশের বেডে অলস বন্ধুকে ঘুমাতে দেখেন, তাহলে আপনিও যে আবার কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে যাবেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করুন যারা পরিশ্রম করে থাকে। কাজ বাদ দিয়ে আড্ডা দিয়ে বেড়ানো বন্ধু এড়িয়ে চলুন। সুযোগ বুঝে নসিহত করুন।

৭। হতাশ বন্ধুঃ 

আপনার নিশ্চয় কিছু স্বপ্ন আছে, তা বাস্তবায়নে আছে কিছু পরিকল্পনা। আপনার বন্ধু কি আপনার স্বপ্নের ক্ষেত্রে বাঁধা সৃষ্টি করে? সেকি আপনাকে ভাল কাজের ব্যাপারে যে স্বপ্ন দেখছেন, তাতে অনুতসাহিত করে। হতাশা ব্যঞ্জক কথা বলে আপনার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে? তাহলে মনে রাখুন, এ ধরনের বন্ধুর সাথে অন্তরংগ না হওয়াই উত্তম। আপনার দরকার সেই বন্ধু যে আপনাকে সাহস দিবে, উৎসাহ দিবে, যে আপনার স্বপ্নের ব্যাপারে আশাবাদী। এরাই আপনাকে চলার পথে সাহস যোগাবে, সহযোগিতা করবে। 

সম্পর্ক ছেদ! এটাতো ঠিক না??!!

আপনাদের এক্ষেত্রে এই বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। ভাবতে পারেন হয়তো আমি সম্পর্ক ছেদের কথা বলছি। ব্যাপারটি আসলে তা নয়। আমি সম্পর্ক একেবারে শেষ করে দিতে বলছিনা। আমি বলছি তাদের সাথে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব না করতে। তাদেরকে এত কাছে না নিয়ে আসতে যাতে আপনি নিজেও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যান। তাদের সাথেই অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব করুন যারা তাকওয়ার অধিকারী।

একটি হাদিস দিয়ে লেখা শেষ করি।

রাসুল (সাঃ) বলেছেন,

প্রত্যেকেই তার বন্ধুর দ্বীন অনুসরণ করে থাকে। অতএব, তোমরা কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সতর্ক হও। (আবু দাউদঃ ৪৮৩৩)।

Leave a Reply