তাকওয়া আমল করার জন্য সাতটি ব্যবহারিক উপায়


তাকওয়া সবসময়ই একটা তাত্ত্বিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় আমাদের কাছে। আমরা সব মুসলমানই জানি যে আমাদের তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে কিন্তু কিভাবে? কিভাবে আমরা তাকওয়া অবলম্বন করব কিন্তু জানিনা। ইনশাআল্লাহ নিচের সাতটি পয়েন্ট এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারব কিভাবে আমাদের ব্যবহারিক জীবনে আমরা তাকওয়ার উপর আমল করতে পারি।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে তাকওয়া হচ্ছে একটি আন্তরিক ইবাদত। এটা এমন একটা ব্যাপার যা অন্তরের মাধ্যমে করতে হয়। এবং এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি হাসিল হয়। কাজেই কিভাবে এটা করতে হবে তা জানা আমাদের জন্য আবশ্যিক।
নিচে যে সাতটি পয়েন্ট আলোচনা করা হচ্ছে সেটা ইবনে কাইয়্যেম এর মাদারিজ আজ সালিকিন গ্রন্থ হতে নেয়া হয়েছে।

১। মহান আল্লাহ তাআলার গুণ এবং ক্ষমতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা

এটিই প্রথম ধাপ। তাকওয়া অর্জন করতে হলে মহান আল্লাহপাকের জাত শিফাত এবং গুণ সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। বুঝতে হবে এবং জানতে হবে যে মহান আল্লাহপাক সবকিছুর ধারক ও বাহক। তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তিনি সাফল্য দিয়ে থাকেন
আল্লাহ সবকিছু জানেন তিনি জানেন যে কোন সফলতা আপনার আমার জন্য ভালো এবং খারাপ আল্লাহ সবকিছুৃই দেখেন কাজেই তিনি সাফল্য অথবা বিফলতা সেটার দিকে নয় বরং মানুষের চেষ্টার উপর ভিত্তি করেই পুরস্কৃত করে থাকেন।
মহান আল্লাহপাক অত্যন্ত দয়াম। কাজেই কোন কিছুর ফলাফল যেটাই হোক, সেটা আল্লাহ তাআলার দয়ার অংশ এবং ফলাফল।
আল্লাহ পাক সম্পর্কে যত বেশি স্বচ্ছ ধারণা হবে তত বেশি তার প্রতি তাকওয়া অর্জন করা সহজ হবে। দরকার হলে মহান আল্লাহপাকের জাত এবং গুণ সম্পর্কে আমাদের বেশি বেশি জানতে হবে এবং তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে এবং এটাই তাকওয়া অর্জনের প্রথম ধাপ

২। নিজের লক্ষ্য অর্জন করার জন্য চেষ্টা করা এবং যথাযথভাবে

তাকওয়া অর্জনের দ্বিতীয় ধাপ হলো চেষ্টা করা। চেষ্টা করার মাধ্যমে নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে হবে এবং এটা অর্থাৎ চেষ্টা করার উপায় হচ্ছে দুটি। একটি হলো দুনিয়াবী এবং আরেকটি হল আখিরাত। দুনিয়াবী চেষ্টা বলতে বোঝায় যে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দুনিয়ার যে সমস্ত আসবাব বা পন্থা অবলম্বন করতে হবে তা অবলম্বন করা। অনেকেই এই  দুনিয়াবী চেষ্টা সম্পর্কে ধারণা রাখে এবং এ সম্পর্কে আমাদের কোনো রকমের সমস্যা হয় না।
কিন্তু অপরদিকে দ্বিতীয় যে পদ্ধতি রয়েছে অর্থাৎ আত্মিক চেষ্টা সেটা কিন্তু আমাদের অনেকেরই ধারনার বাহিরে। আত্মিক চেষ্টার মধ্যে যেমন রয়েছে দৈনিক পাঁচবার সালাত আদায় করা হালাল খাওয়া হালাল কামাই করা ভালো এবং খালেস নিয়ত করা এবং মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে বেশি বেশি দুআ করা সফলতার জন্য। আত্মিক চেষ্টা করার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’আলার উপর তাকওয়ার পরিপূর্ণতা আমরা লাভ করতে পারি।
যদি কেউ শুধু দুনিয়াবী আসবাব গ্রহণ করে কিন্তু আত্মিক কাজগুলো করে না তাদের ক্ষেত্রে সফলতা তারা হয়তো পাবে কিন্তু অনেক কষ্ট করতে হবে, মানসিক দুশ্চিন্তা গ্রস্ত হতে হবে কারণ তারা আল্লাহ পাকের কাছে আত্মিক সাহায্য চাচ্ছে না।

৩। অন্তরে মহান আল্লাহপাকের তাওহীদকে জমিয়ে নেয়া বা বসিয়ে দেয়া

তাকওয়া অর্জনের তৃতীয় ধাপ হচ্ছে অন্তরে মহান আল্লাহপাকের তাওহীদ বা একত্ববাদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা এবং জ্ঞান লাভ করা। এর অর্থ হচ্ছে যে মহান আল্লাহই একমাত্র সফলতার ধারক ও বাহক তিনি ছাড়া এবং তার ইচ্ছা ছাড়া কোন কিছুই হতে পারেনা।
অন্তরের মধ্যে তাওহীদের উপর বলিষ্ঠ বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে অন্তরে তাকওয়া লাভ হবে এবং মহান আল্লাহপাকের উপর ভরসা আসবে। 

৪। আল্লাহর ফয়সালার উপরে রাজি খুশি থাকা

তাকওয়া অর্জনের এটা চতুর্থ ধাপঃ আমরা মহান আল্লাহপাকের কাছে সাহায্য চাবো এবং এর ফলে তিনি আমাদের জন্য যেটাই ফয়সালা করবেন সফল হোক বিফল হোক তার উপর আমাদের রাজি খুশি থাকতে হবে। আমাদেরকে এটা বিশ্বাস করতে হবে যে মহান আল্লাহপাক কখনোই আমাদেরকে ত্যাগ করবেন না। এর ফলে দেখবেন আপনি এবং আমি, আমরা সবাই আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে একটা শান্তি অনুভব করতে পারব। সহসাই বিচলিত হব না।

৫। মহান আল্লাহ পাক সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা 

ভালো ধারণা করা হচ্ছে আমাদের সময়ে একটা মৃতপ্রায় সুন্নাহ। মানুষের প্রতি যেমন ভালো ধারণা রাখা জরুরি, তার চেয়েও বেশী জরুরী মহান আল্লাহপাকের উপর বা তার ফয়সালা সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা। একজন মুসলমান সবসময়ই আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখে। তাকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হয় যে আল্লাহ পাক যা কিছুই করেন ভালোর জন্যই ক।
তাকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হয় এবং হবে যে মহান আল্লাহপাক তার দোয়া শুনে থাকেন এবং তা কবুল করে থাকেন। আর তাকওয়ার ক্ষেত্রে ভালো ধারণা হচ্ছে এই বিশ্বাস রাখা যে মহান আল্লাহতায়ালা শেষমেশ অবশ্যই দ্বিন এবং দুনিয়ার ক্ষেত্রে তাকে উত্তম ব্যবস্থায় দিবেন।

৬। মন থেকে সন্দেহ ঝেড়ে ফেলা


শয়তান সবসময়ই চেষ্টা করবে মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে। সে ভয় দেখাবে বিফলতার, সে ভয় দেখাবে দারিদ্র্যের এবং সে ভয় দেখাবে অপমানিত হওয়ার। শয়তান আপনার মনের ভিতরে আল্লাহ সম্পর্কে কু ধারণা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করবে। আপনার চেষ্টাকে দমে দিতে চেষ্টা করবে। আপনার এবং আমাদের উচিত হবে এ ধরনের সমস্ত সন্দেহ মন থেকে ঝেড়ে ফেলা এবং আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা ঢুকিয়ে নেয়া। 
যেমন যদি শয়তান আপনাকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় তাহলে আপনি নিজে নিজে মনে রাখবেন, মনে করবেন মহান আল্লাহ তা’আলা সমস্ত কিছুর রিজিক নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তিনি নিজেই রিজিকের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন। এই ধারণা আপনাকে শক্ত রাখবে এবং আপনাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে দূরে রাখবে। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে দূরে থাকাটা তাকওয়ার জন্য একটি অপরিসীম উপাদান।

৭। সমস্ত কিছুই মহান আল্লাহর হাওয়ালা করে দেয়া


তাকওয়ার সাতটি ধাপ এর মধ্যে সব শেষ ধাপ হলো যেকোনো কিছুই মহান আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা। শুধুই আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা আর কারো কাছে সোপর্দ না করা।
দুনিয়াবী এবং আত্মিক এই দুই ধরনের চেষ্টা করার পর একজন মুসলিম তার অন্তর এবং মনকে সন্দেহ থেকে দূরে রাখবে। আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা করবে এবং আল্লাহ যে ফয়সালা করে দেবেন তার উপর সন্তুষ্ট থাকবে। তাহলে এই শেষ যে ধাপ রয়েছে সেই ধাপের ফল সে ভোগ করতে পারবে। সত্যি কথা হলো, যত কিছুই করি না কেন আমরা শেষমেশ মহান আল্লাহপাকের উপরই তার নিয়তি নির্ভর করে।

একটি বাস্তবসম্মত উদাহরণ

নিচে একটি উদাহরণের মাধ্যমে তাওয়া কিভাবে আমল করতে হয় তা বোঝানো হলো
ধরুন আহমদ নামে একজন মুসলিম রিজিকের তালাশে একটা বিজনেস বা ব্যবসা করতে চায়।
সে জানে যে আল্লাহ তা’আলাই রিজিকদাতা এবং আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্য চান যেন বান্দারা হালাল উপায়ে রিজিক অর্জন করে।
সে এখন ব্যবসা শুরু করার জন্য দুনিয়াবী আসবাব গ্রহণ করে চেষ্টা করে। সে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে এবং নিজে নিজে এটা বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তা’লা ছাড়া কিছুই তার সাফল্য এনে দিতে পারে না।
সে এটা বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তাআলা সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সেজন্য সে অন্তরে একটা শীতলতা বা শান্তি অনুভব করে। সে জানে যে মহান আল্লাহপাক তার জন্য যেটা উত্তম সেটাই তার তাকদীরে প্রদান করবেন।
সে তার অন্তরকে দারিদ্র্য থেকে ভয় মুক্ত করে ফেলে এবং তার অন্তরে সবসময়ই এই যিকির রাখে যে আল্লাহ তার সাথে আছেন এবং আল্লাপাক যে ওয়াদা করে থাকেন তা কখনোই লঙ্ঘন করেন না।
এরপর সে তার ব্যবসা শুরু করে কিন্তু এ ব্যবসা নিয়ে এসে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে হতাশ হয়ে যায় না। সে নিয়মিত কষ্টের পর কষ্ট করে তার ব্যবসার কাজ চালিয়ে যায় এবং মহান আল্লাহর উপর ভরসা রাখে এবং দু’আ করে যেন আল্লাহ পাক তাকে সফলতা দান করেন। 
ফলাফল ক সেই ব্যক্তিটি সফলতা লাভ করে এবং ভাল একজন ব্যবসায়ী হয় এবং সেজন্য সে খুশি হয়। সে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করে তাকে ধন্যবাদ জানায় এবং তার রোজগার কে আল্লাহর পথে ব্যয় করে।
ফলাফল খ ব্যবসায় সফলতা লাভ করতে পারে না তারপরও সে আল্লাহতে সন্তুষ্ট থাকে এবং সেটাই বিশ্বাস করে যে যার তার জন্য যা ভাল, আল্লাহ তাকে সেটাই দিয়েছেন। তার এই ব্যবসা থেকে ভুল ত্রুটিগুলো শুধরে নেয় এবং আবার আরেকটি নতুন ব্যবসা শুরু করে। এবার সে আবার সেই.১ থেকে পরবর্তীতে ধাপগুলো রয়েছে সেগুলো পালন করে এবং নতুনভাবে আশা করে যে, সে হয়তো আল্লাহতালার ইচ্ছাতেই ব্যবসায় সফলতা লাভ করবে।
এভাবেই তাকওয়া এর উপর আমল করতে হয়
‎মহান আল্লাহপাক আমাদেরকে তাকওয়া অবলম্বন করার জন্য তাওফীক দান করুন আমীন।



Leave a Reply