এই রমাযানে যে লক্ষ্য নিয়ে এগোতে পারেন

সামনেই আসছে রমাযান। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিৎ এই রমাযানে কিছু লক্ষ্য স্থির করা এবং সেভাবে এগিয়ে যাওয়া। আমি নিজেকে এবং আর সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, রমাযান হলো মহান আল্লাহপাকের নৈকট্য লাভের মাস, সন্ন্যাসী হওয়ার মাস নয়। তবে শেষ দশ দিনের কথা আলাদা। শুধু রমাযান মাস নয়, আমাদের লক্ষ্যগুলো এমন হওয়া উচিৎ যেন সেগুলো আমরা পরবর্তী মাসগুলোতেও ধরে রাখতে পারি। এমনই কিছু বিষয় নিচে দেয়া হলো যা আপনি এই রমাযানে লক্ষ্য হিসেবে স্থির করতে পারেনঃ
    
ফরয ইবাদাতঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে আদায় করা অত্যাবশ্যকীয় করে নিতে হবে। আমাদের অনেকেরই ফযর সালাতে জামাত ধরা ও নিয়মিত ওঠা নিয়ে সমস্যা থাকে। এই সমস্যা দূর করার জন্য রমাযানই শ্রেষ্ঠ সময়।

সুন্নাহঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সুন্নত নামায হলো ১২ রাকাত। এই ১২ রাকাত সালাত নিশ্চিত করতে হবে।

সালাত উদ্‌ দুহাঃ সালাত উদ্‌ দুহা নিয়মিত আদায়ের অভ্যাস করার জন্য রমাযান মাস অনন্য।

তারায়ীহ্‌র সালাতঃ রমাযান এবং তারায়ীহ্‌ কথা দুটো যেন অঙ্গাঅংগীভাবে জড়িত। কিন্তু আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, এশার সালাতের গুরুত্ব তারায়ীহ্‌র চেয়ে অনেক বেশী। কাজেই কোন অবস্থাতেই এশার সালাতের জামাত যেন ছুটে না যায়। 

বিত্‌রঃ  রাসুলুল্লাহ্‌ (সাঃ) কখনই বিত্‌র এর সালাত ত্যাগ করেন নি। এমনকি মুসাফির অবস্থায়ও তিনি এই সালাত আদায় করেছেন। রমাযান মাসে সাধারণত ইমাম তারায়ীহ্‌র ন্যায় জামাতে এই সালাত আদায় করে থাকেন। নিয়মিত বিত্‌র সালাতের অভ্যাস পোক্ত করার জন্য রমাযান এক অনন্য সুযোগ।

তাহাজ্জুদ সালাতঃ রমাযানের শেষ দশ দিনে অনেকেই লাইলাতুল ক্বদরের খোঁজে নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করে থাকে। এই সুযোগে আমরাও পারি তাহাজ্জুদের অভ্যাসকে রমাযান কেন্দ্রিক না করে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। 

মসজিদে সালাত আদায়ঃ অনেকেই আছেন সাধারণ সময়ে ফরয সালাতগুলো জামাতে আদায় করতে পারেন না। রমাযান মাসকে বেছে নিন নিয়মিত ফরয সালাত জামাতে আদায় করার অভ্যাস করার জন্য।   

নফলঃ নিজেকে শুধু উপরের ফরয, ওয়াজিব বা সুন্নতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেই হবেনা, যতটা সম্ভব নফল সালাত ও আদায় করতে হবে। 


কোরআন

আরবীতে তেলাওয়াতঃ এ মাসে বেশী বেশী কোরআন তেলাওয়াত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত। কোরআন আরবীতে পাঠ করার মাঝেও অনেক মাহাত্ম্য রয়েছে। প্রতিটা অক্ষরে নেকীতো আছেই, সেই সাথে আমাদের ঈমানের বৃদ্ধিতেও এর ভুমিকা অপরিসীম। অনবরত তেলাওয়াত একজন মুসলমানকে আরবী ভাষা শেখার ব্যাপারেও আগ্রহী করে তুলতে পারে।তাই আমাদের অন্তত এক খতম দেয়া উচিৎ এ মাসে। 

কোরআনের অর্থ পড়াঃ এ মাসে এটা আমাদের জন্য অত্যাবশকীয় করে নিতে হবে। আরবীর সাথে সাথে বাংলা অর্থ ও পড়তে হবে। এতে কোরআনে মহান আল্লাহ পাক আমাদের জন্য কি বার্তা পাঠিয়েছেন, তা জানা সম্ভব হবে। কোন বিশেষ আয়াত নিয়ে সন্দেহ বা প্রশ্ন হলে কোন হক্ব আলেমের কাছে গিয়ে জেনে নিতে হবে। অবশ্য তাফসীরে ইবনে কাসীর এক্ষেত্রে পড়া যেতে পারে।

তেলাওয়াত শোনাঃ কোরআন তেলাওয়াত শোনাও একটি বড় নেক কাজ। যতটা সম্ভব কোরআন তেলাওয়াত শুনতে হবে আমাদের। প্রয়োজন হলে রাস্তা ঘাটে চলতে ফিরতে, গাড়িতে বসেও কানে হেডফোন দিয়ে তেলাওয়াত শুনতে পারেন। যদিও একজন সরাসরি তেলাওয়াতকারীর কাছ থেকে শোনা আর অডিও শোনার সওয়াব এক নয়। তবে অডিও শুনলে সওয়াব যে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। 

কোরআন মুখস্ত করাঃ  এ মাসে কোরআনের কিছু অংশ বিশেষ মুখস্ত করার পরিকল্পনা নিন। এক্ষেত্রে আমপারা (৩০ তম পারা) দিয়ে শুরু করতে পারেন। কারণ আমপারার সুরা গুলো ছোট ছোট। অথবা পাঞ্জেগানা সূরা (সুরা আর-রহমান, ইয়াসিন, ওয়াক্বিয়াহ, মুযযাম্মিল, মূলক) মুখস্ত করতে পারেন। এছাড়াও আগের মুখস্ত করা আয়াত বা সুরাগুলো ঝালাই করে নিতে পারেন।
 

ইবাদাহ

ইতিক্বাফঃ রমাযানের শেষ দশ দিন রাসূল (সাঃ) মসজিদে ইতিক্বাফের উদ্দেশ্যে অবস্থান করতেন। কাজেই আমাদেরও ইতিক্বাফ করার মাধ্যমে অনেক বেশী ইবাদাতের চেষ্টা করতে হবে। এই একমাত্র ইবাদাত যা রামাযানের জন্য খাস বা বিশেষভাবে প্রণোদিত। রমাযানের বাহিরে রাসুল (সাঃ) সাধারণভাবে এই ইবাদাত করেননি।  

দোয়াঃ দোয়া হলো ইবাদাতের মগয্‌। কোরআন শরীফে মহান আল্লাহ তাআলা সিয়ামের আদেশ দিতে গিয়ে বলেন,

আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করেকাজেইআমারহুকুমমান্যকরাএবংআমারপ্রতিনিঃসংশয়েবিশ্বাসকরাতাদেরএকান্তকর্তব্য যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে(সুরা বাকারাঃ১৮৬)

এর ঠিক আগের আয়াতেই রমাযান মাসের সিয়াম রাখার ব্যাপারে আল্লাহপাক নির্দেশ দিচ্ছেন। রমাযান মাসের সিয়াম রাখার আদেশ দেয়ার পরের আয়াতেই মহান আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদের দোয়া করার আদেশ দিচ্ছেন। এই দুই আয়াতের সংযোগের অলঙ্করণ দেখেই বোঝা যায় যে রমাযান মাসে দোয়ার গুরুত্ব কতটুকু। ভালো ভালো দোয়ার জন্য হিসনুল মুসলিম দেখতে পারেন। 

যিকির আয্‌কারঃ সকাল সন্ধ্যার যিকির এবং আযকার, বিভিন্ন কাজের আগে পঠিতব্য দোয়া গুলো আত্নস্থ করার উপযুক্ত সময় এই মাস। মনে মনে একটা লিস্ট করুন, কি কি দয়া আপনি মুখস্থ করবেন?  যেই দোয়াই আপনি শিখুন এবং আমল করুন না কেন, চেষ্টা করবেন রমাযানের পরেও যেন সেই দোয়ার উপর আমল চালিয়ে যেতে পারেন। 

তাফাক্কুরঃ তাফাক্কুর অর্থ হল মহান আল্লাহ পাকের সৃষ্টি, তাঁর মহিমা, জান্নাত, জাহান্নাম, নিজের নফ্‌স, গুনাহ ইত্যাদি ব্যাপারে নিবিড় ভাবে চিন্তা ভাবনা করা। ইতিক্বাফের সময় তাফাক্কুর করাটা সব দিক থেকেই সহজ। কাজেই আমরা ইতিক্বাফের সময় তাফাক্কুর করব ইনশাল্লাহ। নিজের নফসের জবাব্দিহিতা, আমলের হিসেব নেয়ার ব্যাপারে তাফাক্কুরের উপকারিতা অপরিসীম। 

দাওয়াহঃ দাওয়াহ্‌র ব্যাপারে বলতে গেলে রমাযান মাসে দাওয়াহ কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। কারণ রমাযান মাসে যেকোন নেকী সত্তুর গুণ বা তাঁর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি করা হয়। 

সামাজিক মূল্যবোধঃ রমাযান মাসে প্রত্যেকেরই সুযোগ হয় নিজের পরিবার পরিজনের সাথে এক সাথে ইফতার করার। তবে এই মাসে শুধু পরিবার নয়, আত্নীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, এলাকার প্রতিবেশী, গরীব দুঃখী, ইয়াতিমদের সাথেও ইফতারী করা উচিৎ এবং তাঁদের ইফতারের আয়োজন করা উচিৎ। 

স্বাস্থ্যগত দিক

পানি শূণ্যতাঃ এবারের রমাযান মাস পড়েছে গরমের মধ্যে। তাই এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ আমাদের সবার জন্য। আমাদের প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। সাধারণত যেটা দেখা যায়, সবাই ক্ষুধা মেটাতে খাবার খায় প্রচুর। কিন্তু প্রচুর পানি পান করেনা। ফলে অনেক সময় জন্ডিস বা এধরণের রোগে ভুগে থাকে। কাজেই এই রমাযান মাসে অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। ভাল হয়, যদি কি পরিমাণ পানি খাচ্ছেন তার হিসেব রাখেন। সাধারণ সময় যদি দৈনিক দেড় লিটার পানি খেয়ে থাকেন, তাহলে এ মাসেও সে পরিমাণ পানি পান করুন।

বিশ্রামঃ যেহেতু আমাদের সিয়াম বা রোযা গরমকালে পড়েছে, এটা স্বাভাবিক যে আমরা একটু বেশী ক্লান্তি অনুভব করব। কাজেই এখন থেকেই আমরা আমদের বিশ্রামের রুটিন ঠিক করে নেব। রুটিন এমন হবে যেন তাতে আমাদের শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়। 
  

খাবার মেন্যুঃ সতর্কতার আমাদের খাবার মেন্যু এবং খাওয়ার পরিমাণ ঠিক করে নিতে হবে। সারাদিন রোযা রেখে ইফতারের সময় অতিরিক্ত পেট ভরে খাওয়া কোন ক্রমেই নির্দেশিত নয়। তেমনি শুধু ভাজাপোড়া খেয়েই ইফতার শেষ করাও স্বাস্থ্য সম্মত নয়। ইফতারের সময় অতিরিক্ত উদরপূর্তি আপনাকে অলস করে দিবে। আপনি আল্লাহর ইবাদাত করতে পারবেন না। এছাড়াও যেটা করতে পারেন, আপনার শরীরের যদি বিশেষ চাহিদা থেকে থাকে, তাহলে সে হিসেবে Supplement গ্রহণ করতে পারেন। Supplementহল অতিরিক্ত ভিটামিন বা এ জাতীয় ঔষধ।

ফিটনেসঃ রমাযানকে অনেকেই ওজন কমানোর এক অনন্য সুযোগ হিসেবে দেখেন। কিন্তু অনেকেই এ মাসে অনিয়মিত খাওয়া দাওয়ার কারণে মুটিয়ে যান। ফিটনেস অভিজ্ঞ রেহান জালালীর মতে, রমাযান আসলে ওজন বাড়ার মাস। তাই আপনি আপনার ওজন কিভাবে নিয়ন্ত্রন করবেন সেটির পরিকল্পনা অবশ্যই করবেন।

সিয়াম বা রোযার ধরণঃ ইমাম গাযযালীর (রহঃ) মতানুযায়ী, আমরা যে সিয়াম রাখি তাঁর তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তরঃ দিবাভাগে পানাহার এবং যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত থাকা। দ্বিতীয় স্তরঃ সকল প্রকার গুনাহ থেকে বিরত থাকা। এবং তৃতীয় স্তরঃ সকল প্রকার গুনাহের চিন্তা থেকে বিরত থাকা। কাজেই আমাদের সবার উচিত আমাদের লক্ষ্য ঠিক করা যে আমরা কোণ স্তরের রোযা রাখব এবং সে অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে হবে।

আর্থিক বিষয় এবং দান খয়রাত

সাদাকাহঃ আমাদের রাসুল (সাঃ) যে পরিমাণ দান খয়রাত করতেন, অন্য কেউই তাঁর মত এত দান খয়রাত করতেন না। আর রমাযান মাসে তা অনেক বেড়ে যেত। কাজেই আমাদের উচিৎ হবে এ মাসে বেশী বেশী দান খয়রাত করা। 

ইফতার করানোঃ কোন মুসলিম অপর মুসলিমকে ইফতার করালে সে পূর্ণ রোযা রাখার সওয়াব পায়, অথচ রোযাদার ব্যক্তির সওয়াব এতটুকু কম করা হয়না। কাজেই পরিকল্পনা করুন কাদের কাদের আপনার বাসায় ইসতার করাবেন। সেই সাথে এলাকার মসজিদ ও বাদ থাকবে কেন?   

যাকাতঃ রমাযান মাসে যে কোন আমল সত্তুর গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। এজন্য অনেকেই এমাসে ফরয যাকাত দিয়ে থাকেন। আপনিও তা করতে পারেন। 

ফিতরাঃ যাকাতুল ফিতরা অবশ্যই আদায় করতে হবে। সুন্নত তরীকায়, যত শীঘ্র সম্ভব তা আদায় করা বাঞ্ছনীয়। প্রয়োজন হলে রমাযানের শুরুতেই এ ব্যাপারে পরিকল্পনা করা উচিৎ।

উমরাহঃ একবার ভাবুন, আপনি ক্বাবা শরীফে তারাবীহ নামায আদায় করছেন এবং উমরাহ করছেন, তাওয়াফ করছেন। আমাদের যাদের সেই সুযোগ হয়নি, তাঁদের এজন্য আল্লাহর কাছে কায়মনো বাক্যে দুয়া করা উচিৎ।

আখলাক্ব

সবশেষে আলোচনা হলেও এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মুসলিমের জন্য। রমাযান হল নিজের আখলাক্ব সুন্দর করার মাস। নিজের চারিত্রিক ত্রুটি এবং দুর্বলতাগুলো সনাক্ত করে তা দূর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা এবং আল্লাহর কাছে দুয়া করতে হবে, সাহায্য চাইতে হবে। আখলাক্বের বিভিন্ন উপাদান নিয়ে আপনি আত্নশুদ্ধি করতে পারেন। যেমনঃ সত্যবাদিতা, বিনয়, দয়ার্দ্র, সবর, বিশ্বস্ততা, ক্রোধ ইত্যাদি। এখানে সামান্যই উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি আপনার মতো করে লিস্ট করে নিতে পারেন। 

করণীয়ঃ

১। রমাযান উপলক্ষে আপনার নিয়্যত গুলো একটি কাগজে আজই লিখুন। রমাযান শুরু হল্যে গেলে সেগুলোর উপর চোখ বুলান। ইনশাল্লাহ আমল করা সহজ হয়ে যাবে। কোন কিছু ভুলে গিয়ে থাকলে মনে পড়ে যাবে। 

২। লেখাটি আপনার পরিচিত মহলে শেয়ার করুন। হয়তো তাঁদের মাঝে কেউ উপকৃত হবেন।

Leave a Reply