ইসলামে যিনার ভয়াবহতা ও শাস্তির হুকুম


বর্তমানে আমাদের সমাজে যিনা ব্যাভিচার এবং নারী পুরুষের মাঝে অনৈতিক সম্পর্ক ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ইসলাম এই গুনাহকে অনেক ভয়াবহ চোখে দেখে। এতই ভয়াবহ ভাবে দেখে যে, যদি বিবাহিত পুরুষ বা নারী যদি যিনায় লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড, পাথর মেরে মৃত্যুদন্ড। এটা শুধু মুহম্মদ (সাঃ) এর শরীয়তে নয়, বরং পুর্বের সকল নবীর শরীয়তেও একই শাস্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। 
মহান আল্লাহপাক সুরা ইসরার ৩২ নং আয়াতে বলেন,

আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ

কুরআনে আল্লাহপাক আরো বলেন,

এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যের এবাদত করে না, আল্লাহ যার হত্যা অবৈধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না যারা একাজ করে, তারা শাস্তির সম্মুখীন হবেকেয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুন হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তত করে এবং দেবেন আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (ফুরক্বান, ৬৮৬৯)

আল্লাহপাক আরো বলেন

ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশকরে বেত্রাঘাত কর আল্লাহর বিধান কার্যকর কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে (আননুর, ০২)

উপরোক্ত শাস্তি শুধুমাত্র অবিবাহিত নারী পুরুষের জন্য প্রযোজ্য। বিবাহিত নারী পুরুষের ক্ষেত্রে বিধান হল তাদেরকে পাথর মেরে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা। বিবাহিত থাকতে হবে এমনটিও শর্ত নয়। আগে বিয়ে হয়েছিল কিন্তু এখন একা, তাঁদের ক্ষেত্রেও একই হুকুম। আর যদি এ সমস্ত নারী পুরুষ তওবা অথবা শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি ছাড়া দুনিয়া ত্যাগ করে, তাহলে জাহান্নামে তাদেরকে কঠিন শাস্তি আস্বাদন করানো হবে।  
ইসরাইলী রেওয়াতে এসেছে, যিনাকারী নারী ও পুরুষকে তাঁদের লজ্জাস্থানের সাথে জাহান্নামে ঝুলানো হবে এবং এভাবে ঝুলিয়ে পোড়ানো হবে। সেই সাথে লোহার চাবুক দিয়ে মারা হবে। তাদের আর্ত চিৎকারে ফেরেস্তারা বলবে, 

কোথায় ছিল এই আর্তনাদ?তোমরাতো হাসাহাসি করতে, ফুর্তি করতে এবং মহান আল্লাহর ব্যাপারে ছিলে উদাসিন, আল্লাহ সবকিছু দেখেন জানা সত্তেও লজ্জা করতেন না।”

নিচের হাদিস গুলো একটু ভালোভাবে পড়ুন,

যিনাকারী যিনা করার সময় তার ঈমান থাকেনা।” (বুখারী)


যখন কেউ যিনায় লিপ্ত হয়, তার অন্তর থেকে ঈমান উঠে যায়। এবং যখন সে বিরত হয়, তার ঈমান আবার ফেরত আসে।” (আবুদাউদ)

 যে কেউ মদ খায় অথবা যিনায় লিপ্ত হয়, আল্লাহ তার থেকে ঈমান এইভাবে উঠিয়ে নেন, যেভাবে মানুষ শরীর থেকে জামা খুলে ফেলে।” (হাকিম)

 তিন ধরনের ব্যক্তির সাথে মহামহিম আল্লাহপাক কথা বলবেন না, তাদেরকে পাপ থেকে পবিত্র করবেন না এবং তাঁদের দিকে তাকাবেন ও না। তারা হলঃ বৃদ্ধ ব্যাভিচারী, মিথ্যাবাদি রাজা বা শাসক এবং অহঙ্কারী দরীদ্র ব্যক্তি।” (মুসলিম)

ইবনে মাসুদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি একবার রাসুল (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন,

মহান আল্লাহপাকের কাছে সবচেয়ে জঘন্য গুনাহ কোনটি?” রাসুল (সাঃ) উত্তরে বললেন, “আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।এরপর আবার জিজ্ঞেস করলে রাসুল (সাঃ) বলেন, “দারীদ্রের ভয়ে সন্তান হত্যা করাআবার জিজ্ঞেস করলে বলেন, “প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যিনায় লিপ্ত হওয়া”

 
হযরত আতা হতে বর্ণিত, যে 

জাহান্নামের দরজাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য এবং ঘৃণ্য হল সেই দরজা, যেটা দিয়ে সেই সব যিনাকারীরা প্রবেশ করবে যারা যিনার পরিণাম জানা সত্তেও যিনায় লিপ্ত হয়।

মখুল আদদিমাশকি বলেছেন

জাহান্নামের অধিবাসীরা এমন এক পচা দুর্গন্ধ পাবে যে তারা বলতে থাকবে, ‘আমরা কখনও এমন দুর্গন্ধ আস্বাদন করিনি।তখন তাঁদের বলা হবে যে এই দুর্গন্ধ হল জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্ত যিনাকারীর লজ্জাস্থানের। এই দুর্গন্ধ সমস্ত জাহানামীদের কষ্ট দিবে। 

রাসুল (সাঃ) হতে বর্ণিত যে

ইবলিস তার সাঙ্গপাঙ্গকে ডেকে মিটিং করে এবং বলে যে, যে শয়তান মানুষকে সবচেয়ে বেশী ধোকায় ফেলতে পারবে তাঁকে আমি মাথায় মুকুট পড়িয়ে দেব। দিন শেষে সব শয়তান একসাথে জড় হয়ে শয়তানকে রিপোর্ট দিতে থাকে যে আমি অমুক ব্যক্তিকে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে ফুসলিয়েছি এবং সে তালাক দিয়েছে। আমি অমুক দুই ব্যক্তির মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান এগুলো শুনে বলবে তোমরা কিছুই করনি। অবশেষে যখন এক শয়তান বলবে আমি অমুক অমুক কে ফুসলিয়ে যিনায় লিপ্ত করেছি। তখন ইবলিস শয়তান খুশী হয়ে তাকে মুকুট পড়িয়ে দিবে। (আসসুয়ুতি

আমরা মহান আল্লাহপাকের কাছে শয়তান ও তার দল থেকে আশ্রয় চাই। আমীন। 
হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসুল (সাঃ) বলেছেন,

ঈমান হচ্ছে পোশাকের মত যা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আবৃত করেন। কিন্তু কেউ যদি যিনায় লিপ্ত হয় তাহলে এই ঈমানের পোশাক ছিনিয়ে নেয়া হয়। যদি সে তওবা করে, তাহলে তাঁকে আবার সেটা ফিরিয়ে দেয়া হয়।” (দাঈলামী) 

রাসুল (সাঃ) বলেছেন, 

হে ঈমানদারেরা! তোমরা যিনা হতে দূরে থাক। যিনার ছয়টি ভ্যাবহ পরিণতি। যার তিনটি দুনিয়ায় এবং তিনটি আখিরাতে। দুনিয়ার তিনটি হলঃ চেহারা বিবর্ণ হয়ে যাওয়া, আয়ু কম হওয়া এবং দারীদ্র বেড়ে যাওয়া। আর তিনটি হল আখিরাতেঃ আল্লাহর অভিসম্পাত, হিসাব কঠিন হয়ে যাওয়া এবং আগুনের শাস্তি।” (আস-সুয়ুতি)

আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আরো বলেন, 

যে ব্যক্তি মদপান করে এবং এভাবে মারা যায়, আল্লাহ তাকে ‘গুতা’ নামক নদী হতে পান করাবেন। গুতা হল জাহান্নামের এমন এক নদী যেটা যিনাকারী নারীদের লজ্জাস্থান হতে নির্গত তরল দিয়ে তৈরী হয়েছে।” (আহমদ) 

আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আরো বলেন, 

শিরকের পর সবচেয়ে জঘণ্য গুনাহ হল অবৈধ গর্ভে বীর্যপাত করা। (ইবনে জাওযী)

জাহান্নামে একটি উপত্যকা আছে যা সাপে পরিপূর্ণ। প্রত্যেকটি সাপ উটের গলার ন্যায় মোটা। এই সাপ বেনামাযীকে দংশন করবে। ফলে এর বিষ সেই ব্যক্তির দেহে ৭০ বছর ধরে ক্রিয়া করবে। এরপর তার শরীর থেকে মাংশ খসে খসে পড়বে। জাহান্নামে হাযান নামক আরেকটি উপত্যকা আছে যেটা সাপ ও বিচ্ছু দিয়ে পরিপূর্ণ। 

প্রত্যেকটি বিচ্ছু আকৃতিতে খচ্চরের ন্যায়। সেগুলোর ৭০ টি সাঁড়াশী থাকবে যা দিয়ে সে দংশন করবে। সেটা যিনাকারীদেরকে দংশন করে বিষ ঢেলে দিতে থাকবে। এই বিষ ক্রিয়া ১০০০ বছর পর্যন্ত ক্রিয়াশীল থাকবে। এরপর তার মাংশ খসে খসে পড়বে ও লজ্জাস্থান থেকে দুর্গন্ধময় পুঁজ নির্গত হবে।
যখন কোন ব্যক্তি বিবাহিত নারীর সাথে যিনা করে, তখন তাদেরকে সমগ্র মানদজাতির অর্ধেক পরিমাণ মানুষকে যে পরিমাণ শাস্তি কবরে দেয়া হয়, সেই পরিমাণ শাস্তি তাদের দেয়া হবেএবং হাশরের ময়দানে, মহান আল্লাহপাক সেই যিনাকারী নারীর স্বামীকে ডাকবেন। 

যদি স্বামী তার স্ত্রীর এই অপকর্ম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থেকে থাকেন, তাহলে সেই স্বামীকে তার স্ত্রীর সমস্ত নেকআমল ধংস করে দেয়ার অধিকার দিবেন। আর যদি সে ব্যক্তি তার স্ত্রীর এই অপকর্মের ব্যাপারে জেনেও কিছু বলেন নাই এমন হয়, তাহলে সেই ব্যক্তিকে তার স্ত্রী সহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। কারণ জান্নাতের একটি দরজায় লেখা আছে, ‘দাইয়ুসের জন্য জান্নাত হারাম।’
 যে ব্যক্তি কোন নারীকে লালসাবশতঃ স্পর্শ করে অথচ তার জন্য তা হালাল ছিলনা, তাকে ক্বিয়ামতের দিনে ঘাড়ে হাত লটকানো অবস্থায় উত্থান করা হবে। যদি চুম্বন করে, তাহলে তার ঠোঁট আগুনে ঝলসানো হবে। যদি পরিপূর্ণ যিনা করে থাকে, তাহলে তার উরু তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে এই বলে যে, ‘আমি অবৈধ শরীরে শুয়েছিলাম’। 

এরপর আল্লাহ তার প্রতি রাগান্বিত হয়ে তাকাবেন। ফলে তার চেহারা থেকে মাংস খসে পড়ে যাবে। যদি সে অস্বীকার করে, তাহলে তার জিহ্বা সাক্ষ্য দিবে, ‘আমি যিনার কথা বলেছি।’ হাত বলবে, ‘আমি স্পর্শ করেছি।’ চোখ বলবে, ‘আমি দেখেছি।’ পা বলবে, ‘আমি অবৈধ কাজ করার জন্য হেটে গিয়েছি।’ 

সবশেষে লজ্জাস্থান বলবে, ‘আমি কাজ পরিপূর্ণভাবে ঘটিয়েছি।’ লিপিবদ্ধকারী ফেরেস্তাদের একজন বলবে, ‘আমি শুনেছি।’ আরেকজন বলবে, ‘আমি লিখেছি।’ আল্লাহপাক বলবেন, ‘আমি জানতাম কিন্তু গোপন রেখেছিলাম’। এরপর আল্লাহ ফেরেস্তাদের বলবেন সেই ব্যক্তিকে নিয়ে শাস্তি দিতে।যে আল্লাহকে লজ্জা করেনা তার উপর আল্লাহর চরম অভিশাপ। 
এর সমর্থনে কোরআনে আল্লাহপাক বলেন,

যেদিন প্রকাশ করে দেবে তাদের জিহবা, তাদের হাত ও তাদের পা, যা কিছু তারা করত” (সুরা নুর, আয়াত ২৪

যিনার মধ্যেও জঘন্য যিনা হচ্ছে যাদের সাথে বিয়ে হারাম তাদের সাথে যিনা করা। যেমনঃ নিজের মা, বোন, সৎ মা, খালা ইত্যাদি। 
রাসুল (সাঃ) বলেন

যে ব্যক্তি এমন কারো সাথে যিনায় লিপ্ত হয় যার সাথে তার বিয়ে হারাম ছিল, সেই ব্যক্তিকে হত্যা কর।” (আল হাকিম)

আল বারা হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল (সাঃ) একবার তাঁর চাচাকে পাঠালেন এক লোককে হত্যা করতে। সেই লোক তার সৎ মায়ের সাথে যিনায় লিপ্ত হয়েছিল। এবং হত্যার পর সেই লোকের সম্পদ ও পাঁচ ভাগ করে বন্টন করে দিতে বলেছিলেন যেভাবে গনীমত বন্টন হয়। 
মহান আল্লাহর কাছেই আমরা সব কিছু থেকে আশ্রয় চাই। 

আপনিও হন ইসলামের একজন দায়ী। শেয়ার করে সকলে জানিয়ে দিন।

One Reply to “ইসলামে যিনার ভয়াবহতা ও শাস্তির হুকুম”

Leave a Reply